
বিশ্বে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় আয়োজন অলিম্পিকের এবারের আসর বসছে লন্ডনে। সেইসঙ্গে এ বছর অলিম্পিককে ঘিরে নানা আয়োজন থাকছে। তারই অংশ হিসেবে লন্ডনের বিখ্যাত গ্লোব থিয়েটার বিশ্বের ৩৭টি দেশের ৩৭টি ভাষায় শেক্সপিয়ারের ৩৭টি নাটক নিয়ে আয়াজন করেছে ‘গ্লোব টু গ্লোব’ নাট্যোৎসবের। বাংলাদেশের ঢাকা থিয়েটারের কাছেও সেই আমন্ত্রণ আসে বাংলায় শেক্সপিয়রের নাটক করার জন্য। থিয়েটারটি এই কালজয়ী নাট্যকারের রচিত শেষ নাটক ‘দি টেম্পেস্ট’কে বেছে নেয়। সেটা ২০১১ সালের জুলাই মাসের ঘটনা। এরপর অনেক সময় পার হয়েছে। দলটি তাদের নাটকের প্রদর্শনীর জন্য এখন অবস্থান করছে লন্ডনে। ইতোমধ্যে তারা নাটকের দু’টি শোও করেছে লন্ডনের গ্লোব থিয়েটারে। এর মহড়া কক্ষে বসেই দলটির প্রধান ও এই নাটকের নির্দেশক নাসির উদ্দীন ইউসুফ-এর সঙ্গে ৪ মে এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন গ্লিটজ-এর সঙ্গে। ওই আলাপের কথার সূত্র ধরেই এবারের মূল রচনা লিখেছেন রাশেদ শাওন।

শঙ্খ বাজলো স্বশব্দে। ছুটলো জাহাজ ফেনিল ঢেউয়ের চূড়ায় চূড়ায়। তবে এরিয়েলের ঘূর্ণিঝড় তাকে এগোতে দেয়নি। তার তাণ্ডবে মাঝ সমুদ্রে ডুবে যায় অ্যালেনজোর জলযান। অভিযাত্রী দল ভাসতে ভাসতে আটকা পড়ে সাগরক‚লের এক দ্বীপে। তবে এ এরিয়েলের খেলা নয়। এ ঝড় উঠেছিলো প্রসপেরোর মায়া-জাদুর ইশারায়। স্পিরিটদ্বয়কে সঙ্গে করে সে তার বিজয় উল্লাস বুঝিয়ে দেয় দর্শকদের।
ঢাকা থিয়েটারের প্রযোজনা ৩৬ উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ‘দি টেম্পেস্ট’। এর কাহিনী গড়ে উঠেছে প্রসপেরোকে ঘিরেই। সহোদরের ষড়যন্ত্রে রাজত্ব থেকে নির্বাসিত হয়ে মিলানের অধিপতি শিশুকন্যা মিরান্ডাসহ ভাসতে ভাসতে এক দ্বীপে আশ্রয় নেন। প্রসপেরো আপন সাধনায় মানুষের চেয়ে বেশি ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে। সে নিজের দাস বানিয়ে ফেলে প্রকৃতির নানা শক্তি এবং অশরীরীদেরও। দেখতে দেখতে পার হয় ১২ বছর। মিরান্ডাও ততোদিনে যৌবনে পা রেখেছে। এমন সময় প্রসপেরোর ইশারায় ঝড় ওঠে। জাহাজডুবি হয়। তার শত্রুরা একে একে এসে পৌঁছায় একই দ্বীপে। তারপর! নির্বাসন, প্রতিশোধ, ক্ষমা, প্রায়শ্চিত্ত এবং প্রেম-ভালোবাসা-মিলনের মধ্য দিয়ে এর সমাপ্তি। তবে এতে যুক্ত হয় উপনিবেশ বিরোধীতা, সাম্যবাদী রাষ্ট্রভাবনা আর প্রকৃতিপ্রেম।

‘বিশ্ব রঙ্গমঞ্চে ঝংকৃত হোক বাঙলা নাটকের শ্বাশত সুর’ শ্লোগানকে উপজীব্য করে নাটকটির নতুন এ পরিবেশনার নির্দেশনা দিয়েছেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ ও অনুবাদ করেছেন রুবাইয়াৎ আহমেদ।
শেক্সপিয়ার তার নাট্যরীতিতে ইউরোপিয় রীতি মেনেই শেষ নাটক লিখেছিলেন ৪শ’ বছর আগে। তবে ঢাকা থিয়েটার এই প্রযোজনাটি তৈরি করেছে বাংলার প্রাচীন নাট্যরীতিতে। নির্দেশক নাসির উদ্দীন ইউসুফের ভাষায়, ‘এখানে একটা নতুন থিয়েটার ল্যাঙ্গুয়েজও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। থিয়েটার একরকম হয়, সেটা আমাদের একটা ধারণা আছে। কিন্তু এর বাইরেও থিয়েটার হওয়া উচিত। প্রয়াত সেলিম আল দীন ও আমার গ্রাম থিয়েটারের একটা চেষ্টা ছিলো, আমাদের নিজস্ব বাংলা ঐহিত্যবাহী নাট্যরীতির আলোকে একটা আধুনিক নাট্যভাষা তৈরি করা যায় কিনা। তো সেটা অনেক দিন হলো। অনেক কাজই চলছে। এই নাটকে সম্ভবত আমরা একটি সুনির্দিষ্ট কাজ করছি। আর এর পেছনে আমার নির্দেশিত ‘নিমজ্জন’ এর উৎসাহ আছে। যদিও ওখানে কিছুটা ওয়েস্টার্ন প্রভাব ছিলো। ইস্ট-এর আঙ্গিকও ছিলো তাতে। অন্য নাটকগুলোও তাই। শিমূল ইউসুফ নির্দেশিত ‘ধাবমান’-এ তাই। অথবা আমার আগের নাটক ‘বনপাংশুল’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘চাকা’ প্রভৃতিও এর উদাহরণ। কিন্তু, এই নাটকটি একেবারে বাংলার পাঁচালী রীতি এবং মনিপুরী। এই দুইয়ের সংমিশ্রণ একটি সর্বজনগ্রাহ্য এবং বোধগম্য। এখানে ভাষার কাঠিন্য আড়াল হয়েছে যেনো। এতে যদি সংলাপ নাও বলি, বোধকরি মানুষ তাও এটা বুঝবে। সুতরাং সেই থিয়েটারের ভাষাটা খোঁজার চেষ্টা করছি। আমরা দেখলাম বাংলায় আছে নাকি। ওই গবেষণাটা ছিলো। ওই খোঁজাটা ছিলো। আমার মনে হয়েছে আমরা একটা পথ তৈরি করতে পেরেছি।’

নাসির উদ্দীন ইউসুফ এই নাট্যরীতি নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন ‘সংবাদ কার্টুন’ দিয়ে। জেনে নিন তার নিজের কথায়। ‘রিদম নিয়ে কাজ করার শুরু সেই ‘সংবাদ কার্টুন’ থেকে। ঢাকা থিয়েটারে আমার প্রথম নাটক ছিলো সেটি। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ‘জন্ডিস’ করেছি। কাজটা করেছিলাম ঝোঁক থেকে। আমার জন্ম ঢাকায়। বড় হওয়া ঢাকায়। কিন্তু, পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে গ্রামের সঙ্গে, গ্রাম থিয়েটার করতে গিয়ে আবার যেটা অর্জন করি, সেটা হচ্ছে গান। আমার গান-বাজনা শোনার একটা অভিজ্ঞতা ছিলো। সেখান থেকে হয়তো কিছুটা নিয়েছি। এখানে বলে রাখা ভালো, ‘সংবাদ কাটুন’ আমার নির্দেশিত দ্বিতীয় নাটক। সেটাতে প্রচণ্ড রকম নাচ এবং গীত, বাদ্য এগুলোর প্রভাব ছিলো।


‘আমি মনে করি, গান-বাজনা, শারীরিক কসরতের যে মিশ্রণ এটা বাংলা ভাষার নাটকের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারা সংযোজন করেছে। এটার সূচনা করেন সেলিম আল দীন-ই। এখন সেই ধারাটার কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন বলে দাবি করেছেন নাসির উদ্দিন ইউসুফ। তার ভাষায়, ‘আমি দাবি করতে পারবো না, এটা একটি আদর্শ কাজ হয়েছে। তবে কাছাকাছি গেছি বলে মনে হয়। মানে ইঙ্গিতটা আছে। নতুন পরিচালকরা যদি এখান থেকে অনুপ্রেরণা পায়, সেটা হচ্ছে আমার স্বার্থকতা। আর এটা হচ্ছে গবেষণার। যদিও আমি যাচ্ছি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উৎসবে। ওয়ার্ল্ডের বিগেস্ট ফেস্টিভাল বলা হচ্ছে এটা। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, পৃথিবীর সেরা সব দলগুলো আসছে এখানে। আমার মনে হয়, বাংলাদেশ যদি প্রতিনিধিত্ব করতে পারে সাংস্কৃতিক ভাবে বিশ্বমঞ্চে। আজকের এই সংঘাতময় বাংলাদেশের চিত্রটা যতো না ফুটে উঠছে, বাদন, তার বিপরীতে যদি সাংস্কৃতিক এই ঢোল, এই নৃত্য, গীত, রঙ, ঢেউ নাচের মধ্যে দেখবেন। সমুদ্রের পানির একটা কলরব দেখতে পাচ্ছেন। এগুলো যদি আমরা পশ্চিমকে নিশ্চিতভাবে একটা আলাদা ইমেজ দাঁড়াবে বিশ্বের কাছে। সুতরাং আমাদের সফলতাটা তখন বোঝা যাবে।