মাহমুদুল হকের `খেলাঘর' যেভাবে ছবি হলো

১৯৮৪ সাল। মোরশেদ তখন দুরন্ত তরুণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে মাষ্টার্সে পড়ছেন। চতুর্থ বর্ষে পড়া অবস্থায় বানানো প্রথম চলচ্চিত্র ‘আগামী’ তাকে এনে দিয়েছে বিপুল খ্যাতি আর সম্ভাবনাময় পরিচালকের সম্মান। শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে জাতীয় পুরষ্কারও জিতে নিয়েছে এটি। তরুণ তুর্কির মতো সেই সময় টগবগ করে ফুটতে থাকা মোরশেদ স্বপ্ন দেখছেন, বদলে ফেলবেন এই ব-দ্বীপের প্রচলিত সিনেমার কাঠামো, পুরোনো, জীর্ণ সবকিছু।

সাপ্তাহিক বিচিত্রা তখন নামী পত্রিকা হিসেবে সমাদৃত। তার শিক্ষক আ ব ম ফারুক একদিন তাকে ডেকে বললেন, “তুমি কি বিচিত্রায় প্রকাশিত ‘খেলাঘর’ উপন্যাসটি পড়েছো?” তিনি মাথা নেড়ে জানালেন, না। উপন্যাসটি পড়ার সৌভাগ্য তার হয়নি। ফারুক স্যার আবার বললেন, “পড়ে দেখতে পারো, মনে হয় ভালো একটি সিনেমা হবে।” শিক্ষকের পরামর্শ শিরোধার্য মেনে মোরশেদ বিচিত্রা জোগাড় করলেন। পড়েও ফেললেন ‘খেলাঘর’। ঠিক করলেন যে, এই উপন্যাসটিকে তিনি সিনেমা বানাবেনই। এটি ’৮৪ বা ’৮৫ সালের ঘটনা।
২.
২০০৮ সাল। ২১ জুলাই। পাভেল, মানে আজাদ আবুল কালাম, বাংলা একাডেমীতে গিয়েছিলেন এদেশের একজন বিশিষ্ট লেখকের মরদেহকে সম্মান জানাতে। পরে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বটু ভাইয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল একবারই। একটি আড্ডায় তিনি কথা বলেছিলেন আমার সাথে। তারপর তার সঙ্গে আমার আর কখনো দেখা হয়নি। কিন্তু আমি মনে করি, তিনি একজন বিরল প্রজাতির লেখক। লেখার অনন্যসাধারণ বিষয়বস্তু ও কৌশল তাকে বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্ট জায়গা করে দিয়েছে। আমি তাকে অত্যন্ত পছন্দ করি। প্রাচ্যনাট থেকে আমরা তার ‘কালোবরফ’ উপন্যাসটি মঞ্চায়ন করব। এ বছরই কাজটি করতে চাই। এই উপন্যাস তেমনভাবে আমরা বদলাবো না। শুধু নাটকীয়তা ও উপস্থাপনের স্বার্থে কাহিনীকে আগে-পিছে করব।”
গিয়েছিলেন গিয়াসউদ্দিন সেলিমও। তিনি জানালেন, “বটু ভাই বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ লেখক। তার লেখা আমার অত্যন্ত পছন্দের। তিনি ক্ষমতাবান কথাসাহিত্যিকদের একজন। তার ‘জীবন আমার বোন’ আমার প্রিয় উপন্যাস। তিনি অন্যদের মতো স্রোতে গা ভাসিয়ে দেননি। আমি ‘খেলাঘর’ সিনেমাটিও দেখেছি। তিনি ছিলেন জাতশিল্পী।”
তার মতো আরো অনেকেই ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হয়েছিলেন বাংলা একাডেমীর চত্ত্বরে।
৩.

যার প্রসঙ্গে কথা হচ্ছে, সেই মাহমুদুল হক পরিচিতজনের কাছে ‘বটু ভাই’ নামেই পরিচিত, তিনি জানতেও পারলেন না তাকে কত মানুষ ভালোবাসে!
জন্মেছিলেন ওপার বাংলায়। ১৯৪০ সালে পশ্চিমবঙ্গের বারাসাতে। দেশভাগের পর এলেন এই সবুজ উর্বরভূমিতে। পুরোনো ঢাকার গেন্ডারিয়াতে বসবাস করতে শুরু করলেন।
বাবা ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা। কিন্তু ছকে বাঁধা জীবন তার ভালো লাগেনি কখনোই। ফলে হয়েছেন আলাদা, একেবারেই আলাদা। ছয়ভাই, চারবোন মানে দশজনের বিশাল সংসারে চারনম্বর এই ভাইটি উচ্চমাধ্যমিক পড়েছেন জগন্নাথ কলেজে। তারও আগে থেকে লেখালেখি শুরু করেছেন।

শিশুদের কাগজ আলাপনী, শাহীন সেতারায় নিয়মিত লিখতেন। পরিণত বয়সে এসে তুলে ধরলেন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জীবনের কথামালার অনুপম বর্ণনা। লিখেছেন ‘জীবন আমার বোন’, ‘কালোবরফ’, ‘খেলাঘর’ ‘অনুর পাঠশালা’, ‘মাটির জাহাজ’, ‘অশরীরী’র মতো দুর্দান্ত সব উপন্যাস। গল্পগ্রন্থ লিখেছেন স্রেফ একটি-‘প্রতিদিন একটি রুমাল’। তার লেখার প্রতিটি বিষয়ই আলাদা এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ। আর তার ভাষার নির্মাণ ও শব্দচয়ন এতোটাই আলাদা যে, তিনি হয়েছেন একেবারেই আলাদা ঘরানার লেখক, এমনকি অনন্যও।
৪.
ফিরে যাই মোরশেদের কথায়। সিনেমা হবে খেলাঘর উপন্যাস। মোরশেদের বানানো। কিন্তু নানান সমস্যা তার পিছু ছাড়ে না। টাকা নাই, এই নাই, সেই নাই। তারপরও কেন তিনি এই উপন্যাসটি সিনেমায় রূপ দেবেন? তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের ওপর অনেক সিনেমা তৈরি হয়েছে। লেখা হয়েছে বেশকিছু ভালো উপন্যাসও। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের একটি সিনেমা হবে। কারণ উপন্যাসটি অভিনব। মুক্তিযুদ্ধ উপন্যাসের কোথাও দেখানো হয়নি। কিন্তু যুদ্ধে এই জাতি কতোটা বিপর্যস্থ হয়েছে তার বিবরণ উঠে এসেছে এক নারীর জীবনের ভেতর দিয়ে। আর উপন্যাসটি পড়ার সময় সবকিছুই ভিজ্যুয়ালি আমার চোখে ভেসে ওঠে, সবকিছু যেন পরিস্কার দেখতে পাই আমি।”

মোরশেদ কাকে করবেন যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লেখা এই উপন্যাসের মূল চরিত্র? ঠিক করলেন, সুবর্ণা মুস্তাফাই হবেন তার ছবির নায়িকা। সঙ্গে থাকবেন আফজাল হোসেন। কিন্তু মোরশেদের ভাষ্যমতে, “প্রধানত সুবর্ণার অনাগ্রহের কারণেই আমি তাকে নিয়ে তখন ছবিটি বানাতে পারিনি।”
সুবর্ণা মুস্তাফা রাজী হন, হন না-এই অবস্থা যখন চলছে, মোরশেদুল ইসলাম কিন্তু মোটেও দমে যান নি। দু’য়েক বছর পরপরই চেষ্টা করেছেন সিনেমাটি বানোনোর। কারণ তিনি পুরোপুরি আচ্ছন্ন ছিলেন ‘খেলাঘর’-এ। এর মধ্যেই নব্বই দশকে তৌকির আহমেদ, আজাদ আবুল কালামকে সঙ্গে নিয়ে আফসানা মিমিকে মূল চরিত্র ধরে তিনি আবার ছবিটি বানানোর উদ্যোগ নিলেন। কিন্তু এখানেও সমস্যা পিছু ছাড়ে না। তাদের নিয়েও তিনি ছবিটি নির্মাণে হাত দিতে পারলেন না। মাঝে লাভ বলতে, তিনি বটু ভাইয়ের কাছাকাছি চলে এলেন।

’৮৪ সালে যে পরিচয় তাদের মধ্যে আলাপের সূচনা করেছিল, ২০০৬ সালের ২৬ মার্চ সকালে বলাকা সিনেমা হলে খেলাঘরের মহরত অনুষ্ঠান আয়োজন পর্যন্ত সেটি অক্ষুন্ন ছিল। ওইদিন মহরতে এমনকি মোরশেদুল ইসলামকেও অবাক করে দিয়ে মাহমুদুল হক নিজেই হাজির হয়েছিলেন।
নানা বিষয়ে আলাপ করতেন তারা। মোরশেদুল ইসলাম বলেন, “আমার সঙ্গে তার যখন পরিচয় হয়, সেই ’৮৪ সালে তখন তিনি থাকতেন এলিফেন্ট রোডের বাড়িতে। তখনও তিনি নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতেন। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, তিনি ছিলেন চমৎকার আলাপী মানুষ। গল্প করার মতো মানুষ পেলেই মেতে উঠতেন আলাপে, আড্ডায়। তার সঙ্গে কথা বলতে আমার খুবই ভালো লাগতো। খুব যে ঘন ঘন যেতাম, তা নয়। কিন্তু সহজ একটা সম্পর্ক ছিল আমাদের। আমি তার লেখার ভীষণ ভক্ত। তিনি একজন অসাধারণ লেখক। তার পাঠকগোষ্ঠী তেমন বড় নয়। কিন' যারা তাকে পছন্দ করতেন, তারা উন্মুখ হয়ে পড়তেন এক একটি লেখা। তিনি পাঠককে মোহাবিষ্ট করে রাখার অসম্ভব ক্ষমতা রাখেন। তার নিজস্ব বর্ণনারীতি অত্যন্ত সাবলীল। প্রতিটি উপন্যাস, গল্পের বিষয়বস্তুই আলাদা। শুধু উপরিকাঠামোর ভেতরেই তিনি সীমাবদ্ধ থাকতেন না, প্রতিটি বিষয়েরই একেবারে গভীরে চলে যেতেন। তার লেখাগুলোর ভিজ্যুয়াল ইমেজ আমাকে দারুণভাবে আকর্ষণ করে। তার লেখা-জীবন আমার বোন, মাটির জাহাজ ও যেখানে খঞ্জনা পাখি (অনুর পাঠশালা) আমার প্রিয় উপন্যাস।”
স্মৃতি হাতড়ে তিনি আরো বলেন, “আমার প্রায় আঠারো বছরের সিনিয়ার ছিলেন তিনি। ফলে খুব সহজেই তার সঙ্গে আমি মিশে যেতে পারতাম না।” লেখালেখি বিষয়ে তাকে কখনো উচ্ছসিত হতে দেখেন নি মোরশেদ। এমনকি নিজের লেখালেখি নিয়ে কথাও বলতে চাইতেন না মাহমুদুল হক-এই বঙ্গের বিরলপ্রজ কথাকার। “তবে সবসময়ই একলা থাকতেন বটু ভাই”- এটা বরাবরই মনে হয়েছে মোরশেদের।
মাহমুদুল হক তার উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ তৈরির ক্ষেত্রে মোরশেদকে কোনো ধরণের শর্ত দেন নি। মোরশেদ নিজেই বললেন, “আমি তার অনুমতি নিয়ে ফেলেছিলাম। উপন্যাস তার। সিনেমা আমার। ফলে ছবিটি আমি আমার মতোই বানাবো-এটা তিনি বুঝে গিয়েছিলেন।”
একে তো নিজে বিজ্ঞানের ছাত্র, তার ওপর পড়তেও ভালোবাসেন বিজ্ঞানের বই। পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোর্তিবিদ্যা মোরশেদুল ইসলামের খুবই প্রিয়। কিন্তু তিনি জানতে পারেননি কোন ধরণের বই পড়তে ভালোবাসতেন বটু ভাই। তারা যখন বন্ধু ছিলেন, সেই সময়ে নানা কাণ্ড ঘটে গেছে পৃথিবীতে। আমেরিকা ইরাক আক্রমণ করেছে, গণতন্ত্র এসেছে এদেশে-এসব কিছুই উঠে আসতো তাদের আলাপে।
তাদের আলাপ যখন চলছে নিয়মিত, মোরশেদুল ইসলাম খুঁজে চলেছেন অর্থের যোগান আর ছবির পাত্র-পাত্রী। অবশ্য ছবিটি শুরু করতে দেরী হলেও তিনি বসে থাকেননি। বানিয়েছেন ‘চাকা’, ‘দূরত্ব’ ইত্যাদি।
শেষপর্যন্ত তিনি মেলাতে পারলেন সবকিছুই। সাবা নামের এক নতুন অভিনেত্রীকে পেয়ে তার মনে হলো এই-ই পারবে সেই উপন্যাসের তরুণীর ভূমিকায় সবচেয়ে ভালো অভিনয় করতে। আর প্রধান পুরুষ চরিত্রে তিনি বেছে নিলেন রিয়াজকে। সিনেমার প্রতিষ্ঠিত নায়ক একজন বিকল্প ধারার পরিচালককে যে সহযোগিতা করেছেন তা অবিশ্বাস্য। ২২ আগষ্ট ’০৫ তারিখে সোনারগাঁওয়ে একটানা ২১ দিনের শুটিংয়ে রিয়াজ স্রেফ একদিন একবেলা ঢাকা গিয়েছিলেন একটি একান্ত ব্যক্তিগত জরুরী কাজে, তাও পরিচালকের সদয় সম্মতিতে। পরিচালক বলে দিয়েছিলেন সবাইকে, আগামী একুশ দিন কেউ যেন ইউনিটের বাইরে না যায়। তার আশংকা ছিল, প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে ঢাকা যাবার বাতিক উঠতে পারে। কিন্তু সেই ভয়কে মিথ্যা প্রমাণ করে সবাই-ই দারুণ সহযোগিতা করেছিল তাকে। সাবাকে তার মনে হয়েছে ‘খুবই ডিরেক্টর ডিপেন্ডেন্ট আর্টিষ্ট’, যে কি না পরিচালকের চাহিদাটা সবসময়ই বুঝতে চেষ্টা করে। গাজী রাকায়েতের অভিনয়ও তার ভালো লেগেছে।
তারপর বাকী সবকাজ শেষ হলো ঠিকঠাক মতই। আর প্রিমিয়ারের কথা তো আগেই বলা হয়েছে।
এদেশের অন্যতম প্রধান বিকল্প ধারার ছবির পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম মাহমুদুল হক ওরফে বটু ভাইয়ের মৃত্যুর পর বলেছেন, “এই শক্তিমান লেখককে আমি সারাজীবন মনে রাখব।”
৫.
মোরশেদ এখন পরিকল্পনা করছেন, মাহমুদুল হকের ‘জীবন আমার বোন’ ও ‘যেখানে খঞ্জনা পাখি’-উপন্যাস দুটি অবলম্বনে ছবি বানানোর।
বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/ওমর শাহেদ-আহমেদ সাব্বির/এমআইআর/ জুলাই ২৩