পিংক ফ্লয়েডের পথচলা

সময়টা ষাটের দশকের। শুরুটা সাইকেডেলিক এবং স্পেস রক দিয়ে হলেও ৭০ এর দশকে বিবর্তিত হয়ে প্রগ্রেসিভ রক ধারায় চলে আসে। পিংক ফ্লয়েডের গানের জগতে পথ চলার শুরু অনেকটা এভাবেই। জনপ্রিয় এই ব্যান্ডের গাওয়া গানগুলো আজও যেন শ্রোতার হৃদয়ের সঙ্গে মিলে মিশে তৈরি করে এক অদ্ভুত শিহরণ। এই যুগেও জনপ্রিয় ভাবে চলে আসা এই ব্যান্ডের পথচলা নিয়েই এবারের গ্লিটজ এর মিউজিক আয়োজন। লিখেছেন নাজিয়া তাবাস্সুম।

লন্ডনভিত্তিক রক ব্যান্ড পিংক ফ্লয়েড। ব্যান্ডটি ১৯৬৫ সালে তাদের যাত্রা শুরু করলেও ১৬৯৩ সাল থেকে এরা মূল কাজ শুরু করে। অনেকরকম ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে জন্ম হয়েছে বিশ্বখ্যাত এই ব্যান্ডটির। ব্যান্ডটির সূচনা করেছিলেন দুই সদস্য রজার ওয়াটার্স এবং নিক মেসন। লন্ডনের রিজেন্ট স্ট্রিট পলিটেকনিকে স্থাপত্য কলা পড়তে গিয়েই পরিচয় হয় তাদের। পরিচয় থেকেই বন্ধুত্ব এবং জুটি বেঁধে গান করা শুরু। এই জুটি প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে গান পরিবেশন করার সময়ই দেখা পায় কিথ নোবল এবং ক্লিভ মেটকিফের। এই চারজনের সঙ্গে পরবর্তীতে আরও যোগ দেন রিচার্ড রাইট। একসঙ্গে অনুশীলনের সময় রাইট থাকতেন গিটারে আর মেসন বাজাতেন ড্রামস। সেসময় রাইটের বান্ধবী তাদের অনুশীলনের নিয়মিত অতিথি ছিলেন। এই ছোট্ট মিউজিক গ্রæপটিই তখন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পারফর্ম করতো। তখন তাদের জন্য গান লিখতেন কোন চ্যাপমান।

১৯৬৩ সালের সেপ্টেম্বরে ওয়াটার্স এবং মেসন দলীয় রিহার্সালের জন্য একটি ফ্ল্যাটে চলে যান। ফ্ল্যাটটি ছিল মাইক লিওনার্ডের। তিনি মাঝে মধ্যে তাদের দলের হয়ে কি বোর্ড বাজাতেন। এরইমধ্যে একটা সময় মেসন ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যান এবং তখনই গিটার বাদক হিসেবে আগমন ঘটে বব ক্লোজের। তখনো খ্যাতির স্বাদ না পাওয়া এই গ্রুপটির নাম ছিল ‘টি সেট’। এছাড়াও আরও কয়েকটি নামে পরিচিত ছিল গ্রুপটি। এরপর ওয়াটার্সের ছেলেবেলার বন্ধু সিড ব্যারেট-এর আগমন ঘটে তাদের গ্রুপে। এদিকে ক্লোজ দল ছেড়ে চলে যান তাদের প্রথম পারফর্মেন্সের আগেই। ওদিকে ‘টি সেট’ নামে অন্য একটি গ্রুপ থাকায় এই নামটিও দল থেকে মুছে যায়। সে সময়ই সিড ব্যারেটের উদ্যোগে এই গ্রুপের নাম হয় ‘পিংক ফ্লয়েড’। ব্যারেট ‘পিংক ফ্লয়েড’ নাম দিয়েছিলেন দুজন মিউজিশিয়ান ‘পিংক অ্যান্ডারসন’ এবং ‘ফ্লয়েড কাউন্সিল’ এর সংযুক্তির মাধ্যমে। সিড ব্যারেট দলের প্রধান কণ্ঠশিল্পী এবং লিড গিটারিস্ট হন। তখন থেকেই একটি শক্তিশালী ব্যান্ড গঠনের স্বপ্ন নিয়ে পথ চলতে শুরু করে পিংক ফ্লয়েড।

প্রথম দিকে পিংক ফ্লয়েডের খুব একটা পরিচিতি না থাকলেও লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড মিউজিক জগতে ধীরে ধীরে তাদের আধিপত্য বাড়তে থাকে। সেসময় ব্যারেটের ‘বাটারফ্লাই’ এবং ‘লাকি লিভ’ নামের দুটো রেকর্ডও বের হয়। তারা তখন লন্ডনের ‘কাউন্ট ডাউন’ ক্লাবে নিয়মিত বাজাতেন। ধীরে ধীরে এটি পিংক ফ্লয়েড এর আবাসিক প্যাডে পরিণত হয়। মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত তারা সেখানে পারফর্ম করতেন। দলের এই পরিচিতি লাভের শুরুতে বাবা ও কলেজের শিক্ষকদের উপদেশে এই সময়টাতেই দল ছাড়তে বাধ্য হন ক্লোজ।

ধীরে ধীরে পিংক ফ্লয়েডের পারফরমেন্স সবার কাছে জনপ্রিয় হতে থাকে। ১৯৬৬ সালে মারিকুরি ক্লাবে পারফর্ম করার সময় তাদের পরিচয় ঘটে পিটার জেনার-এর সাথে। এরপর পিটার এবং তার ম্যানেজার কিংস-এর সহায়তায় পিংক ফ্লয়েড বিখ্যাত পত্রিকা ‘দি ফিনান্সিয়াল টাইমস’ এবং ‘দি সানডে টাইমস’ এর কভারেজ অর্জন করে। এভাবে তাদের পরিচিতি আরও বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে তাদের কনসার্টগুলো আরো জনপ্রিয় হতে থাকে। এতে করে ব্যান্ডটির আর্থিক স্বচ্ছলতাও বাড়ে। এভাবে একসময় তারা নিজেদের গানবাজনার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো কেনার সামর্থ্য অর্জন করেন। দলের সদস্যদের একক বা দলীয় পারফরমেন্সের খবর আস্তে আস্তে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

দলের এমন সাফল্যের শুরুতে, ১৯৬৭ সালে হঠাৎ করেই ব্যারেটর আচরণে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। মূলত মাদকাসক্তের প্রভাবেই ব্যারেটের অস্থিরতা এবং অস্থিতিশীল আচরণ আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। ব্যারেটের এই মাদক সমস্যা দলের অন্যান্যদের নতুন সদস্য খুঁজতে বাধ্য করে। এসময় ব্যারেট দলে আরও চারজন নতুন সদস্য নেয়ার কথা চিন্তা করেন এবং তার আমন্ত্রণে ডেভিড গিলমোর দলের পঞ্চম সদস্য হিসেবে পিংক ফ্লয়েডে যোগ দেন। গিলমোর তখন ছিলেন ব্যান্ডটির সেসময়ের দ্বিতীয় ভোকালিস্ট এবং লিড গিটারিস্ট। ব্যারেট থাকাকালীন সময়ে তার দুটি একক গান ‘আর্নল্ড লেইন’ এবং ‘সি এমিলি প্লে’ মুক্তি পায়। এ ছাড়া তাদের প্রথম সফল অ্যালবাম ‘দি পাইপার এট দি গেটস ডন’ সেসময়ই মুক্তি পায়।

১৯৬৮ সালে ব্যারেট ব্যান্ড ছেড়ে চলে যাওয়ার পর বেইস গিটারিস্ট, গীতিকার ও গায়ক রজার ওয়াটার্সই ছিলেন ব্যান্ডটির সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার নেতৃত্বেই পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি অ্যালবাম বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করে। ১৯৭৯ সালে রাইট এবং ১৯৮৫ সালে ওয়াটার্স গ্রুপ ছেড়ে চলে গেলেও ব্যান্ডের পথচলা থামেনি। গিলমোর এবং মেসন মিলে রেকর্ড ও ট্যুর অব্যাহত রাখেন। এভাবেই নানা চড়াই উতরাই আর ভাঙ্গা গড়ার মধ্য দিয়ে দলের সদস্যরা মিলে একটি স্থায়ী ব্যান্ডে পরিণত হতে সক্ষম হন। অবশ্য দলের এই অস্থিতিশীল লাইনআপের কারণে মাঝে তাদের কিছু অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়েছিল। আবার পরে তা তারা কাটিয়ে উঠতেও সমর্থ হয় পিংক ফ্লয়েড।

শুরুর দিকে সাইকেডেলিক এবং স্পেস রক-এর মাধ্যমে বিপুল খ্যাতি অর্জন করেছিল পিংক ফøয়েড, কিন্তু ১৯৭০-এর দশকে বিবর্তিত হয়ে তা চলে আসে প্রগ্রেসিভ রক ধারায়। তাদের গানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যহচ্ছে দার্শনিক গীতিকাব্য, শব্দ নিয়ে বিচিত্র সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অ্যালবাম এর প্রচ্ছদে সৃজনশীল আর্টের বিস্তৃতি এবং জনপ্রিয় লাইভ শো। সব দিক দিয়ে পিংক ফ্লয়েড রক মিউজিকের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রশংসিত এবং জনপ্রিয় ব্যান্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম। ৭০-এর দশকে প্রগ্রেসিভ রক ধারায় পিংক ফ্লয়েড এর প্রভাব অনেক, সে সময়কার ‘জেনেসিস’ বা ‘ইয়েস’ এর মতো ব্যান্ড দলগুলোও পিংক ফ্লয়েডের প্রভাবে সরাসরি প্রভাবিত হয়। এ যুগের ‘নাইন ইঞ্চ নেইল্স ’বা ‘ড্রিম থিয়েটার’ এর মতো সফল ব্যান্ডগুলোর পেছনের প্রভাবক হিসেবেও পিংক ফ্লয়েডের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।

পিংক ফ্লয়েড গত পাঁচ দশকেরও বেশী সময় ধরেছে মাতিয়ে রেখেছে রক দুনিয়া। ‘দি পাইপার অ্যাট দি গেট্স ডন’, ‘আ সসারফুল অব সিক্রেটস’, ‘উমাগুমা’, ‘অ্যাটম হার্ট মাদার’, ‘মিডল’, ‘দি ডার্ক সাইড অফ দি মুন’, ‘উইশ ইউ অয়্যার হিয়ার’, ‘আনিমেলস’, ‘দি ওয়াল’, ‘দি ফাইনাল কাট’, ‘এ মোমেন্টারি ল্যাপ্স অফ রিজন’, ‘দি ডিভিশন বেল’, ‘রক অপেরা’ এর মতো অ্যালবামের মধ্য দিয়ে তারা জায়গা করে নিয়েছে রক কিংবদন্তী হিসেবে।

সর্বকালের সবচেয়ে বাণিজ্যসফল রক মিউজিক ব্যান্ড হিসেবেও চলে আসে পিংক ফ্লয়েডের নাম। তাদের ২০ কোটিরও বেশি অ্যালবাম বিশ্বব্যাপী বিক্রি হয়েছে। যার মধ্যে সাত কোটি ৪৫ লাখ কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই বিক্রি হয়েছে। গত বছর দি সানডে টাইমসের রিচ লিস্টের হিসেব অনুযায়ী ১০ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সম্পদ নিয়ে বিশ্বের ২২ তম ধনী মিউজিক আর্টিস্ট পিংক ফ্লয়েড।

এই বিপুল সম্পদ এবং খ্যাতির মতোই পুরস্কার এবং সম্মানের তালিকাটাও বেশ বড় পিংক ফ্লয়েডের। প্রভাবশালী সংগীত সাময়িকী ‘রোলিং স্টোন’ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ১শ রক আর্টিস্টের তালিকায় ৫১ তম স্থান অর্জন করেছে পিংক ফ্লয়েড। এখানে এককভাবে গিলমোরের স্থান ছিল ১৪ তম গ্রেটেস্ট গিটারিস্ট হিসেবে। এছাড়াও ‘কলিন লারকিন্স’ এর জরিপেও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ৫০ রক আর্টিস্টের তালিকায় তৃতীয় স্থান অর্জন করে পিংক ফ্লয়েড।

সঙ্গীতের সবচেয়ে বড় সম্মান হিসেবে খ্যাত গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডও বেশ কয়েকবার নিজেদের ঝুলিতে ভরেছে পিংক ফ্লয়েড। এ ছাড়াও বিভিন্ন অ্যালবাম ও একক পরিবেশনার জন্য তারা ভূষিত হয়েছে জুনো অ্যাওয়ার্ড ও পোলার মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসের মতো পুরস্কারে।

২০০৫ সালে পিংক ফ্লয়েডের সাবেক আট সদস্য প্রায় ২৪ বছর পর প্রথম একসঙ্গে মঞ্চে ওঠেন ‘লাইভ ৮’ শোতে। এ আয়োজন ছিল ১৯৮৫ সালে আফ্রিকার দূর্ভিক্ষ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে আয়োজন লাইভ এইডের ২০ বছর পূর্তি উদযাপন। এরপর ২০০৬ সালে গিলমোর তার একক রেকর্ড ‘অন অ্যান আইল্যান্ড’ প্রকাশ করেন তার ৬০ তম জন্মদিন উপলক্ষে। এরপর ২০১০ এবং ২০১১ তে তারা আরও বেশ কয়েকবার লাইভ শোতে অংশ নেন। এভাবে তারা আজও রক মিউজিক ভক্তদের জন্য দিয়ে যাচ্ছেন নানা উপহার।

প্রায় দেড় শতাধিকের ওপর গান এবং জনপ্রিয় অ্যালবামের অধিকারী পিংক ফ্লয়েড দীর্ঘদিন অন্তরালে থাকলেও তারা এখন আবার নতুন করে শুরু করেছেন দর্শকদের ভালোবাসার কারণেই। তাদের গানগুলো আজকের তরুণ সমাজের কাছে বিপুলভাবে জনপ্রিয়। তাই সবার অনেক চাওয়া এই ব্যান্ড দলটির কাছে। তাদের এই গানগুলো চির অম্লান হয়ে থাকবে সবার হৃদয়ে যুগ যুগ ধরে।



বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/নাজিয়া/এসএন/ওএস/এইচবি/মার্চ ২০/১২

| More
Page: 1